আজ আমরা যে খতিয়ান, দাগ আর খাজনার কথা বলি, তার শিকড় কয়েকশো বছর পেছনে। সময় ধরে ধরে দেখে নিন।
প্রাচীন ও সুলতানি-মোগল আমলরাজা বা বাদশাহ ছিলেন রাজস্বের মালিক। প্রজা চাষ করত, ফসলের একটা অংশ খাজনা হিসেবে দিত। রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে থাকত স্থানীয় প্রধান বা জমিদার। জমি ছিল প্রজার চাষের অধিকার, আজকের মতো নিবন্ধিত মালিকানা নয়।
১৫৪০–৪৫: শেরশাহজমি মেপে হিসাব করার ব্যবস্থা চালু করেন। প্রজা পাট্টা ও কবুলিয়ত পেত, অর্থাৎ কী পাচ্ছে আর কত দেবে, লিখিত ছিল।
১৫৮০: আকবর ও টোডরমলজমি মাপ, মাটির মান ও ফসলের দামের হিসাবে রাজস্ব নির্ধারণ। বাংলা সুবায় রাজস্ব ব্যবস্থা এই কাঠামোর ওপর দাঁড়ায়।
১৭৬৫: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিপলাশীর পর কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি পায়, অর্থাৎ রাজস্ব আদায়ের অধিকার।
১৭৯৩: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তলর্ড কর্নওয়ালিসের এই ব্যবস্থায় জমিদাররা জমির স্থায়ী মালিক হন। সরকারকে দেয় রাজস্ব চিরকালের জন্য স্থির হয়। নির্ধারিত দিনে রাজস্ব না দিলে জমিদারি নিলামে উঠত (সূর্যাস্ত আইন)। মাঝখানে একের পর এক মধ্যস্বত্বভোগী তৈরি হয়, প্রজার অবস্থা দুর্বল হয়।
১৮৫৯ ও ১৮৮৫খাজনা আইন এবং বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনে প্রজার দখলি স্বত্ব ও উচ্ছেদ থেকে সুরক্ষার কিছু অধিকার স্বীকৃত হয়।
১৮৮৮–১৯৪০: সিএস জরিপব্রিটিশ আমলে প্রথম দাগ ধরে জরিপ। সময় জেলাভেদে আলাদা।
১৯৪৭: দেশভাগভারত ও পাকিস্তান আলাদা হয়, বাংলা ভাগ হয়ে আমাদের অংশ পূর্ব বাংলা। অনেক পরিবার সীমান্তের এপার-ওপার যায়, বহু জমির মালিকানা জটিল হয়।
১৯৫০: রাজ্য অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনজমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়, প্রজা সরাসরি সরকারের অধীনে আসে। পরিবারপ্রতি জমির সর্বোচ্চ সীমা (সিলিং) নির্ধারণ হয়। এই আইন আজও ভূমি ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। পরে ১৯৫৬ সালে এসএ জরিপ শুরু হয়।
১৯৬৫: শত্রু সম্পত্তি আইনভারতগামী অনেকের জমি শত্রু সম্পত্তি, পরে অর্পিত সম্পত্তি নামে সরকারের তালিকায় যায়। ২০০১ সালের প্রত্যর্পণ আইনে তা ফেরত দেওয়ার পথ খোলে।
১৯৭১–৭২: স্বাধীন বাংলাদেশ১৯৭২ সালের আদেশে পরিবারপ্রতি সর্বোচ্চ ১০০ বিঘা জমির সীমা এবং ২৫ বিঘা পর্যন্ত খাজনা মওকুফ ঘোষিত হয়। ১৯৬৬–৮০ সময়ে আরএস জরিপ।
১৯৭৬–১৯৮৪ভূমি উন্নয়ন কর অধ্যাদেশ ও ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশে কর ও জমির সীমা, বর্গাচাষির অধিকার নতুনভাবে সাজানো হয়।
১৯৯০-এর দশক থেকে: বিআরএসআরএসের পর নতুন করে বাংলাদেশ রিভিশনাল সার্ভে।
২০১৭ থেকে আজস্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন ২০১৭, অনলাইন পর্চা, ই-নামজারি, অনলাইন খাজনা, এবং ড্রোন ও জিএনএসএস নির্ভর বাংলাদেশ ডিজিটাল জরিপ। বিডিএস দেখুন
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, বন্দোবস্ত, অধিগ্রহণ: তিনটি আলাদা কথা
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
১৭৯৩ সালের ব্যবস্থা। জমিদারকে স্থায়ী মালিকানা ও স্থির রাজস্ব। ১৯৫০ সালে বিলুপ্ত।
খাস জমি বন্দোবস্ত
সরকারের খাস জমি নীতিমালা মেনে ভূমিহীন বা যোগ্য পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি দেওয়া। কৃষি খাস জমির জন্য আলাদা নীতিমালা আছে।
ভূমি অধিগ্রহণ
রাস্তা, রেল বা সরকারি প্রকল্পের জন্য সরকার জমি নেয়। আইন অনুযায়ী নোটিশ, আপত্তির সুযোগ ও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার আছে।
আরও যে আইনগুলো জানা দরকার
| আইন | সহজ কথায় |
|---|---|
| রাজ্য অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ | জমিদারি বিলোপ, প্রজার স্বত্ব, জমির সীমা, জরিপ ও রেকর্ডের মূল বিধান |
| রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ | কোন দলিল রেজিস্ট্রি করতে হবে ও কীভাবে |
| সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ | বিক্রয়, দান, বন্ধক ও ইজারার নিয়ম |
| মুসলিম, হিন্দু ও অন্যান্য উত্তরাধিকার আইন | মৃত্যুর পর ওয়ারিশরা কে কত অংশ পাবেন |
| ভূমি উন্নয়ন কর আইন ও বিধি | কর হার, দাখিলা, বকেয়া ও জরিমানা |
| স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন ২০১৭ | সরকারি প্রয়োজনে জমি নেওয়া ও ক্ষতিপূরণ |
| অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন ২০০১ | অর্পিত তালিকাভুক্ত জমি ফেরতের আবেদন |
| ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনাল | জরিপের রেকর্ড নিয়ে আপিলের বিচার |
এখানে আইনের সারকথা দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট মামলা বা বিরোধে আমাদের আইনজীবী টিমের পরামর্শ নিন। তারিখ ও বিধান জেলাভেদে কিছুটা আলাদা হতে পারে।
জমির পুরোনো ইতিহাস বের করতে চান?
আপনার জমির সিএস থেকে বর্তমান পর্যন্ত খতিয়ানের ধারা আমরা সাজিয়ে দিই।